অগ্রক্রয়াধিকার: অধিকার, প্রয়োগ এবং আইনি প্রতিকার
📌 অগ্রক্রয়াধিকার (Right of Pre-emption) হল একটি আইনগত অধিকার, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্থাবর সম্পত্তি (বিশেষত জমি) বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে কেনার সুযোগ দেয়। এটি মূলত সহ-শরিক, প্রতিবেশী বা নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কেন অগ্রক্রয়াধিকার প্রয়োজন?
✅ ভূমি বিভাজন রোধ করা – যেন জমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত না হয়।
✅ পারিবারিক বা যৌথ মালিকানা সংরক্ষণ করা – বহিরাগতদের কাছে সম্পত্তি বিক্রি হলে পরিবারের মধ্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
✅ জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা – যাতে মালিকানার জটিলতা সৃষ্টি না হয়।
✅ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো – সহ-শরিকদের মধ্যে সমস্যা এড়ানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কোথায় অগ্রক্রয়াধিকার প্রযোজ্য?
📍 বাংলাদেশে নিম্নলিখিত আইনগুলো অগ্রক্রয়াধিকার নির্ধারণ করেছে:
1️⃣ কৃষিজমির ক্ষেত্রে:
📌 রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (ধারা ৯৬) অনুযায়ী,
✔ শুধুমাত্র উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সহ-শরিকগণ কৃষিজমির অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন।
✔ নোটিশ পাওয়ার ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে।
✔ যদি নোটিশ না পান, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা যাবে।
2️⃣ অকৃষিজমির ক্ষেত্রে:
📌 অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ (ধারা ২৪) অনুযায়ী,
✔ অকৃষিজ সম্পত্তির ক্ষেত্রে যৌথ মালিক বা প্রতিবেশী অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন।
✔ সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে মামলা করা যাবে।
3️⃣ মুসলিম আইনে:
📌 মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭ অনুসারে,
✔ তিন প্রকার Shufa (শুফা) অধিকার রয়েছে:
Shafi-i-Sharik (যৌথ মালিকানার অংশীদার)
Shafi-i-Khalit (সম্পর্কিত সুবিধাভোগী)
Shafi-i-Jar (প্রতিবেশী – যা বর্তমানে অসাংবিধানিক ঘোষিত)
✔ মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের মামলা সর্বোচ্চ ১ বছরের মধ্যে করতে হয়।
4️⃣ বসতবাড়ির ক্ষেত্রে:
📌 বাঁটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ (ধারা ৪) অনুযায়ী,
✔ যদি কোনো অবিভক্ত বসতবাড়ির অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে অন্যান্য অংশীদাররা সেই সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি বাস্তব ঘটনা বিশ্লেষণ
📍 ঘটনা-১: ভাইবোনের মধ্যে জমির বিক্রি
📌 পরিস্থিতি:
রকি ও রাখি ভাইবোন এবং তারা ২০ শতক জমির যৌথ মালিক।
রাখি তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়।
রকি এই জমি কিনতে ইচ্ছুক ও সামর্থ্যবান।
📌 আইনি প্রতিকার:
সহ-শরিক (Co-sharer) হিসেবে রকির অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে।
তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন।
যদি তিনি ২ মাসের মধ্যে না জানেন, তবে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
✅ রকি আদালতে মামলা করলে জমিটি তিনি পেতে পারেন।
📍 ঘটনা-২: যৌথ মালিকানাধীন পুকুর বিক্রি
📌 পরিস্থিতি:
শিশির ও সুমন যৌথভাবে একটি পুকুরের মালিক।
শিশির তার অংশ একজন বহিরাগতকে বিক্রি করে দেয়।
পুকুরটি সুমনের প্রধান আয়ের উৎস, তাই তিনি এই অংশটি কিনতে চান।
📌 আইনি প্রতিকার:
সহ-শরিক হিসেবে সুমনের অগ্রক্রয়ের অধিকার রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী, তিনি বিক্রির ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে পারবেন।
যদি নোটিশ না পান, তাহলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
✅ সুমন মামলায় জয়ী হলে, তৃতীয় ব্যক্তির ক্রয় বাতিল হবে এবং তিনি পুকুরের মালিক হবেন।
🔹 অগ্রক্রয়ের মামলা করার নিয়ম
✔ মামলায় জমির বিক্রেতা ও ক্রেতাকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
✔ যদি বিক্রির আগে মামলা করা হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
✔ বিক্রির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মামলা করতে হবে।
✔ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা না করলে, অগ্রক্রয়ের অধিকার হারিয়ে যাবে।
🔹 মামলার খরচ ও আর্থিক দিক
📌 কৃষিজমির ক্ষেত্রে:
✔ বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ২৫% ক্ষতিপূরণ এবং ৮% সরল সুদ জমা দিতে হবে।
📌 অকৃষিজমির ক্ষেত্রে:
✔ বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫% ক্ষতিপূরণ এবং উন্নয়নের ওপর অতিরিক্ত ৬.২৫% সুদ দিতে হবে।
✅ মামলা জিতলে আদালতের নির্দেশে নতুন মালিকের নামে জমির রেজিস্ট্রেশন হবে।
মামলা খারিজ হওয়ার কারণ
❌ বৈধ পক্ষদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করা।
❌ নির্দিষ্ট সময়সীমার পর মামলা করা।
❌ যদি সম্পত্তি দান বা ওয়াকফ করা হয়।
❌ যদি এটি সরকারি অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি হয়।
🔹 আপিল ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ
✔ দেওয়ানি আপিল আদালতে আপিল করা যায়।
✔ আপিলেও অসন্তুষ্ট হলে সুপ্রীম কোর্টে রিভিশন দায়ের করা যেতে পারে।
🔹 উপসংহার
🔹 অগ্রক্রয়াধিকার আইন ভূমির সহ-মালিক, অংশীদার ও নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীদের জন্য সুরক্ষা প্রদান করে।
🔹 বৈধ সময়সীমার মধ্যে মামলা না করলে, অধিকার হারিয়ে যাবে।
🔹 সঠিক আদালতে, নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে মামলা করতে হয়।
🔹 অগ্রক্রয় আইন ভূমির মালিকানায় নিরাপত্তা ও সুসম্পর্ক রক্ষা করে।
📌 এই আইন নিশ্চিত করে যে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে এবং ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা কমে যায়।