বিদেশ থেকে জমি বিক্রয়: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা সম্পাদনের আইনি প্রক্রিয়া ও ধাপসমূহ-

জীবিকার প্রয়োজনে বা স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করলেও অনেক প্রবাসীর বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তি (জমি, ফ্ল্যাট বা প্লট) থাকে। নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে সেই জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশে বিশ্বস্ত কাউকে ক্ষমতা প্রদান বা ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ (Power of Attorney) দেওয়ার মাধ্যমে জমিটি বিক্রি করা সম্ভব।

​বাংলাদেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী বিদেশ থেকে মোক্তারনামা সম্পাদনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। নিচে আমেরিকা থেকে জমি বিক্রির উদাহরণসহ পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।

​ধাপ ১: আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ড্রাফটিং (খসড়া তৈরি)

​প্রথমে বাংলাদেশে অবস্থানরত কোনো আইনজীবীর মাধ্যমে যথাযথ আইনি ভাষায় একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল প্রস্তুত করতে হবে।

  • দলিলের বিষয়বস্তু: দলিলে জমির পূর্ণ তফসিল (খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা, পরিমাণ ও চৌহদ্দি) স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
  • ক্ষমতা অর্পণ: যাকে পাওয়ার দেওয়া হচ্ছে (অ্যাটর্নি), তিনি জমিটি বিক্রি করতে পারবেন, বায়নানামা করতে পারবেন, এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিল দাতা হিসেবে স্বাক্ষর করতে পারবেন—এই ক্ষমতাগুলো দলিলে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে।
  • প্রেরক ও গ্রহীতা: যিনি বিদেশে আছেন (দালিল দাতা) এবং বাংলাদেশে যাকে ক্ষমতা দিচ্ছেন (আমমোক্তার গ্রহীতা)—উভয়ের নাম, ঠিকানা ও ছবি দলিলে থাকতে হবে।

​ধাপ ২: দূতাবাসে সম্পাদন ও সত্যায়ন (বিদেশে করণীয়)

​ধরা যাক, জমির মালিক জনাব ‘ক’ আমেরিকায় থাকেন এবং তিনি তার জমি বিক্রির জন্য বাংলাদেশে অবস্থানরত তার ভাই জনাব ‘খ’-কে পাওয়ার দিতে চান।

  • ​জনাব ‘ক’-কে আমেরিকার বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি বা কনস্যুলেটে (যেমন: নিউইয়র্ক কনস্যুলেট বা ওয়াশিংটন ডিসি অ্যাম্বাসি) সশরীরে উপস্থিত হতে হবে।
  • ​সাথে নিতে হবে: ড্রাফট করা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল (সাধারণ কাগজে প্রিন্ট করা), নিজের পাসপোর্ট, ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, এবং আমমোক্তার গ্রহীতা জনাব ‘খ’-এর ছবি ও এনআইডি কপি।
  • ​কনস্যুলার অফিসারের সামনে দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে। অফিসার দলিলটি যাচাই-বাছাই করে সত্যায়ন (Attestation) করে দেবেন।

​ধাপ ৩: দলিল বাংলাদেশে প্রেরণ

​দূতাবাস থেকে সত্যায়িত হওয়ার পর মূল দলিলটি ডিএইচএল (DHL) বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশে আমমোক্তার গ্রহীতার (জনাব ‘খ’) কাছে পাঠাতে হবে।

​ধাপ ৪: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়ন (বাংলাদেশে করণীয়)

​দলিলটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর, আমমোক্তার গ্রহীতাকে এটি ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Foreign Affairs – MOFA) কনস্যুলার সেকশন থেকে পুনরায় সত্যায়ন করিয়ে নিতে হবে।

  • ​এটি নিশ্চিত করে যে, বিদেশের দূতাবাসের স্বাক্ষর ও সিলটি সঠিক।

​ধাপ ৫: ট্রেজারি বা ডিসি অফিসে স্ট্যাম্পিং

​পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত হওয়ার পর দলিলটি যথাযথ মানের স্ট্যাম্পে রূপান্তর করতে হবে।

  • ​আমমোক্তার গ্রহীতা দলিলটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে (DC Office) বা কালেক্টরেট অফিসে যাবেন।
  • ​সেখানে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে দলিলের ওপর প্রয়োজনীয় অংকের স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty) পরিশোধ করে ‘এমবস’ বা স্ট্যাম্প যুক্ত করতে হবে। জমি বিক্রির ক্ষমতার ক্ষেত্রে সাধারণত স্ট্যাম্প ডিউটি জমির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত ফিক্সড স্ট্যাম্প ডিউটি ও ফি প্রযোজ্য হয় (তবে এটি পাওয়ারের ধরণের ওপর নির্ভর করে)।

​ধাপ ৬: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন (চূড়ান্ত ধাপ)

​ডিসি অফিস থেকে স্ট্যাম্পিং শেষ হওয়ার পর, দলিলটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করতে হবে।

  • পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ধারা ৬ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পাঠানো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশে আসার পর অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
  • ​আমমোক্তার গ্রহীতা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে (যেখানে জমিটি অবস্থিত অথবা গ্রহীতা যেখানে বসবাস করেন) গিয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি করবেন। রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলে তিনি আইনত জমিটি বিক্রি করার ক্ষমতা অর্জন করবেন।

​উদাহরণ (Case Study)

​আমেরিকা প্রবাসী জনাব রফিক তার ফেনীর ১ গণ্ডা জমি বিক্রি করতে চান। তিনি আমেরিকায় বসে তার বন্ধু জনাব শফিককে পাওয়ার দিতে চান।

১.  রফিক ফেনীর একজন আইনজীবীর মাধ্যমে দলিলের ড্রাফট তৈরি করে ইমেইলে নিলেন এবং আমেরিকায় প্রিন্ট করলেন।

২.  তিনি নিউইয়র্ক কনস্যুলেটে গিয়ে অফিসারের সামনে দলিলে সই করলেন এবং কনস্যুলেট সেটি সত্যায়ন করে দিল।

৩.  রফিক কুরিয়ারে দলিলটি শফিকের কাছে ফেনীতে পাঠালেন।

৪.  শফিক ঢাকায় গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেটি সত্যায়ন করালেন।

৫.  এরপর ফেনী ডিসি অফিসে গিয়ে তিনি স্ট্যাম্প ডিউটি জমা দিয়ে দলিলে স্ট্যাম্প লাগালেন।

৬.  সর্বশেষে ফেনী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি করলেন। এখন শফিক বৈধভাবে রফিকের পক্ষে জমিটি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবেন।

​আইনি সতর্কতা ও টিপস

  • মেয়াদ: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পাঠানো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৩-৪ মাস) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সত্যায়ন ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।
  • ছবি ও টিপসহি: দলিলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ছবি এবং দাতার টিপসহি (Fingerprint) থাকা বাধ্যতামূলক (দূতাবাসে টিপসহি দিতে হয়)।
  • অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার: জমি বিক্রির বিপরীতে যদি কোনো ডেভলপার কোম্পানিকে ক্ষমতা দেওয়া হয় বা পণমূল্য গ্রহণ করা হয়, তবে সেটি ‘অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ (Irrevocable Power of Attorney) হিসেবে করতে হবে এবং এর নিয়মকানুন কিছুটা ভিন্ন ও কঠোর। সাধারণ বিক্রির জন্য আত্মীয়কে দেওয়া পাওয়ার সাধারণত সাধারণ পাওয়ার বা ‘জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ হয়, তবে তাতে “বিক্রির ক্ষমতা” সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।