‘জবর দখল’ বনাম ‘বিরুদ্ধ দখল’: ভূমি আইনের নতুন সমীকরণে মালিকানা কার?

‘জবর দখল’ বনাম ‘বিরুদ্ধ দখল’: ভূমি আইনের নতুন সমীকরণে মালিকানা কার?

বাংলাদেশে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ। সাধারণ মানুষের কাছে অন্যের জমি দখলে রাখা মানেই জবর দখল। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সব দখলই ‘জবর দখল’ নয়। এখানে ‘জবর দখল’ (Forceful Possession) এবং ‘বিরুদ্ধ দখল’ (Adverse Possession)-এর মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। নতুন ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ পাস হওয়ার পর এই দুই ধরণের দখলের আইনি বৈধতা এবং মালিকানা দাবি নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

আজকের আলোচনায় আমরা এই দুই ধরণের দখলের আইনি ব্যাখ্যা, তামাদি আইনের ২৮ ধারার প্রভাব এবং বর্তমান আইনের বাস্তবতা তুলে ধরব।

১. জবর দখল (Forceful Possession) কী?
জবর দখল হলো গায়ের জোরে, ভীতি প্রদর্শন করে বা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রকৃত মালিককে উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক অন্যের জমি দখলে নেওয়া। এটি সম্পূর্ণরূপে বেআইনি এবং একটি ফৌজদারি অপরাধ। এখানে দখলদারের কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না, কেবল পেশিশক্তিই প্রধান।

উদাহরণ:
রহিম সাহেবের পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত ৫ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে ছিল। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি করিম সাহেব একদিন তার দলবল নিয়ে এসে জোরপূর্বক ওই জমিতে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে ফেলেন এবং রহিম সাহেবকে জমিতে প্রবেশ করতে বাধা দেন। এটি হলো পরিষ্কার ‘জবর দখল’।

২. বিরুদ্ধ দখল (Adverse Possession) কী?
বিরুদ্ধ দখল বা অ্যাডভার্স পজেশন হলো এমন একটি আইনি নীতি, যেখানে একজন ব্যক্তি প্রকৃত মালিকের বিনা অনুমতিতে, সবার অগোচরে নয় বরং প্রকাশ্যে, প্রকৃত মালিকের স্বত্বের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘকাল (সাধারণত ১২ বছর) জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। এই দখলে কোনো জোর-জবরদস্তি বা ভীতি প্রদর্শন থাকে না, থাকে দীর্ঘস্থায়ী দখল।

উদাহরণ:
সাত্তার সাহেব চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন, গ্রামে তার কিছু কৃষি জমি আছে। গ্রামের কৃষক জব্বার মিয়া গত ১৫ বছর ধরে সাত্তার সাহেবের বিনা অনুমতিতেই ওই জমি চাষাবাদ করে আসছেন। সাত্তার সাহেব সব জানেন এবং দেখেন, কিন্তু গত ১৫ বছরে তিনি জব্বার মিয়াকে বাধা দেননি বা উচ্ছেদের জন্য আদালতে কোনো মামলাও করেননি। জব্বার মিয়ার এই দখলটি হলো ‘বিরুদ্ধ দখল’।

কোন দখলটি আইনগতভাবে সিদ্ধ?
আইনের দৃষ্টিতে ‘জবর দখল’ কখনোই বৈধ নয়, এটি শুরু থেকেই অবৈধ (Void ab initio)।
অন্যদিকে, ‘বিরুদ্ধ দখল’ একটি স্বীকৃত আইনি নীতি (ডকট্রিন)। দেওয়ানি আইনে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিরুদ্ধ দখলকারীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর উচ্ছেদ করা যায় না এবং তিনি মালিকানা দাবি করতে পারেন। অর্থাৎ, বিরুদ্ধ দখল আইনগতভাবে সিদ্ধ একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

১২ বছরে মালিকানা লাভের আইনি ভিত্তি (তামাদি আইনের ২৮ ধারা)
তামাদি আইন, ১৯০৮ (The Limitation Act, 1908)-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ১২ বছর বা তার বেশি সময় ধরে জমি ভোগদখল করেন এবং এই সময়ের মধ্যে প্রকৃত মালিক তার দখল পুনরুদ্ধারের জন্য আদালতে মামলা না করেন, তবে ওই জমির ওপর প্রকৃত মালিকের স্বত্ব বা মালিকানা বিলুপ্ত হয়ে যায় (Extinguishment of right)। একেই সহজ ভাষায় ‘বিরুদ্ধ দখলে মালিকানা’ বলা হয়।
অর্থাৎ, ১২ বছর চুপ থাকার কারণে মূল মালিক তার অধিকার হারান এবং দখলদার (বিরুদ্ধ দখলকারী) ভূমির স্বত্ব দাবি করার অধিকার অর্জন করেন।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর প্রভাব : সম্প্রতি প্রণীত ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এ ভূমি দস্যুতা এবং জবর দখলের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

১. জবর দখলের শাস্তি: এই আইনের আওতায় অন্যের জমি জোর করে দখল করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং এর জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, জবর দখল এখন জামিন অযোগ্য অপরাধ হতে পারে এবং এর প্রতিকার দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

২. বিরুদ্ধ দখলের অবস্থান: আপনার উত্থাপিত পয়েন্টটি অত্যন্ত যৌক্তিক। নতুন আইনে ‘অবৈধ দখল’ বা জবরদস্তিকে অপরাধ বলা হলেও, ‘বিরুদ্ধ দখল’ (Adverse Possession) যেহেতু তামাদি আইন দ্বারা স্বীকৃত একটি দেওয়ানি অধিকার, তাই এটি সরাসরি ‘ভূমি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে কি না—তা নিয়ে আইনি বিতর্ক রয়েছে।

বিরুদ্ধ দখল যেহেতু গায়ের জোরে নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীরবতার সুযোগে সৃষ্ট অধিকার, তাই অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন—যতদিন তামাদি আইনের ২৮ ধারা বলবৎ আছে, ততদিন সঠিক শর্ত মেনে বিরুদ্ধ দখলে থাকা ব্যক্তিকে ‘ভূমি অপরাধী’ বা ‘জবর দখলকারী’ বলা যাবে না। তবে নতুন আইনের মূল স্পিরিট হলো—যথাযথ দলিল দস্তাবেজ ছাড়া কেবল দখলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করার পথ সংকুচিত করা।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জবর দখল হলো দণ্ডনীয় অপরাধ, যার স্থান কারাগারে। কিন্তু বিরুদ্ধ দখল হলো মালিকের অবহেলার ফল, যা দখলদারকে সুরক্ষা দেয়। তবে বর্তমানে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইন এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, কেবল মৌখিক বা দখলসূত্রে মালিকানা দাবির চেয়ে দালিলিক প্রমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
তাই জমির মালিকদের উচিত ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই দখল উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায়, তামাদি আইনের ২৮ ধারার খড়গ এবং বিরুদ্ধ দখলের আইনি বৈধতা তাদের মালিকানা হারানোর কারণ হতে পারে।
[নাছের মিয়াজী, অ্যাডভোকেট]

জবরদখল #বিরুদ্ধদখল #ভূমিআইন #বাংলাদেশআইন #তামাদিআইন২৮ধারা #ভূমিরমালিকানা #আইনিপরামর্শ #AdvocateNaserMiazi