মায়ের সম্পত্তি কি মেয়েরা বেশী পায়?দেখে নিই কোন ধর্মের অনুসারীরা মায়ের সম্পত্তিতে ওয়ারিশি/হিস্যা কেমন পায়?

বাংলাদেশে পারিবারিক বা দেওয়ানি বিষয়গুলো (বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার) মূলত যার যার ধর্মীয় আইন বা ‘পার্সোনাল ল’ (Personal Law) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তাই হিন্দু এবং মুসলিম নারীদের সম্পত্তির অধিকারে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
নিচে বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু দায়াভাগ আইন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী কন্যাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
১. হিন্দু দায়াভাগ আইনে কন্যাদের উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার মূলত ‘দায়াভাগ’ (Dayabhaga) মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই আইনটি কিছুটা জটিল এবং এটি আধ্যাত্মিক পিন্ডদান (মৃতের আত্মার শান্তির জন্য ভোগ নিবেদন) ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

​মূল নীতি:
দায়াভাগ আইনে পুত্র, পৌত্র (ছেলের ছেলে) বা প্রপৌত্র (ছেলের ছেলের ছেলে) জীবিত থাকলে কন্যারা বাবার সম্পত্তির কোনো অংশ পায় না। অর্থাৎ, ভাইয়েরা থাকলে বোনেরা বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়।

​কখন মেয়েরা সম্পত্তি পায়?
একজন হিন্দু নারী বা কন্যা তখনই বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন, যখন নিচের শর্তগুলো পূরণ হয়:
১. মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্র নেই।
২. মৃত ব্যক্তির স্ত্রী (কন্যার মা) জীবিত নেই (কারণ মা বেঁচে থাকলে তিনি আগে পাবেন)।

​কন্যাদের অগ্রাধিকারের ক্রম:
যদি পুত্র বা স্ত্রী না থাকে, তবে সব মেয়ে সমানভাবে সম্পত্তি পায় না।

দায়াভাগ আইনে মেয়েদের ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয় এবং অগ্রাধিকার দেওয়া হয়:
​১ম – কুমারী কন্যা (Unmarried Daughter): সবার আগে অবিবাহিত মেয়ে সম্পত্তি পাবে।
​২য় – পুত্রবতী কন্যা (Married Daughter with Son): অবিবাহিত মেয়ে না থাকলে, বিবাহিত মেয়ে যার ছেলে সন্তান আছে, সে পাবে।
​৩য় – পুত্র সম্ভবা কন্যা: যার ছেলে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

​বঞ্চিত শ্রেণি: যে মেয়েরা বন্ধ্যা (সন্তান দানে অক্ষম), বিধবা (যার ছেলে নেই) অথবা যারা কেবল কন্যা সন্তানের মা (ছেলে নেই)—তারা সাধারণত বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না।

​মালিকানার ধরন (জীবনস্বত্ব বা Life Interest):
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হিন্দু আইনে নারী (কন্যা বা স্ত্রী) উত্তরাধিকার সূত্রে যে সম্পত্তি পান, তার ওপর তার ‘নিঙ্কুশ মালিকানা’ (Absolute Ownership) থাকে না। তিনি এটি কেবল ভোগদখল করতে পারেন (জীবনস্বত্ব)। আইনগত জরুরি প্রয়োজন (Legal Necessity) ছাড়া তিনি এই জমি বিক্রি বা দান করতে পারেন না। তার মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি তার নিজের উত্তরাধিকারীদের কাছে যায় না, বরং তার বাবার বংশের পরবর্তী পুরুষ উত্তরাধিকারীর (Reversioner) কাছে ফিরে যায়।
************************************।

​২. মুসলিম আইনে কন্যাদের উত্তরাধিকার
​বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ১৯ ৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’ এবং পবিত্র কুরআনের বিধান (ফারায়েজ) দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে কন্যাদের অধিকার সুনির্দিষ্ট।

​মূল নীতি:
মুসলিম আইনে কন্যারা বাবার সম্পত্তির একজন সরাসরি অংশীদার (Quranic Sharer)। ভাই (পুত্র) থাকুক বা না থাকুক, কন্যা সব সময় সম্পত্তির অংশ পায়। তবে ভাই থাকলে এবং না থাকলে অংশের পরিমাণ ভিন্ন হয়।

বন্টনের নিয়ম:
১. শুধু কন্যা (পুত্র নেই): মৃত ব্যক্তির যদি কোনো পুত্র না থাকে এবং মাত্র একজন কন্যা থাকে, তবে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবে।
২. একাধিক কন্যা (পুত্র নেই): যদি পুত্র না থাকে এবং দুই বা ততোধিক কন্যা থাকে, তবে তারা সবাই মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পাবে এবং নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
৩. পুত্র ও কন্যা থাকলে: যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র এবং কন্যা উভয়ই থাকে, তবে কন্যা ‘রেসিডুয়ারি’ বা অবশিষ্টভোগী হিসেবে গণ্য হবে। এই ক্ষেত্রে বন্টনের নিয়ম হলো ২:১ অনুপাত। অর্থাৎ, এক ভাই যা পাবে, এক বোন তার অর্ধেক পাবে (ভাই ২ অংশ পেলে বোন পাবে ১ অংশ)।

৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

মায়ের সম্পত্তি ও মেয়েদের অধিকার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

​মায়ের নিজস্ব সম্পত্তি (যেমন- দেনমোহরের টাকা, বিয়ের উপহার বা নিজের উপার্জিত সম্পদ) বন্টনের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম আইনে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

​নিচে বিষয়ভিত্তিক পার্থক্যগুলো দেওয়া হলো:

​১. উত্তরাধিকারের ভিত্তি

  •  মুসলিম আইন: এখানে মায়ের সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম বাবার সম্পত্তির মতোই। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয়।
  •  হিন্দু আইন: মায়ের সম্পত্তিকে বলা হয় ‘স্ত্রীধন’। এখানে পিণ্ডদান (আধ্যাত্মিক) নয় বরং মায়ের সাথে মেয়েদের ‘নৈকট্য’ বা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

​২. ভাই বা পুত্র থাকলে মেয়ের অবস্থা

  •  মুসলিম আইন: মায়ের মৃত্যুর পর ভাই (পুত্র) জীবিত থাকলেও মেয়েরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয় না। ভাই ও বোন উভয়েই ওয়ারিশ হয়।
  •  হিন্দু আইন: এটি চমকপ্রদ! স্ত্রীধনের (যৌতুক) ক্ষেত্রে পুত্র বা ভাই জীবিত থাকলেও মেয়েরা অগ্রাধিকার পায়। অর্থাৎ, মেয়ে থাকলে ছেলেরাও মায়ের এই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

​৩. বন্টনের অনুপাত

  •  মুসলিম আইন: এখানে ২:১ অনুপাত মেনে চলা হয়। অর্থাৎ, মায়ের সম্পত্তিতে এক ভাই যা পাবে, এক বোন তার অর্ধেক পাবে। ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুণ পায়।
  •  হিন্দু আইন: এখানে ভাগাভাগির চেয়ে ‘অগ্রাধিকার’ বেশি চলে। মায়ের বিশেষ কিছু সম্পত্তিতে (যেমন বিয়ের সময় পাওয়া উপহার) অবিবাহিত মেয়েরা পুরোটার মালিক হতে পারে, সেখানে ছেলেরা কোনো অংশই পায় না।

​৪. মেয়েদের অগ্রাধিকারের ক্রম (Priority)

  •  মুসলিম আইন: বিবাহিত বা অবিবাহিত—সকল মেয়ে সমান অধিকার পায়। বৈবাহিক অবস্থা এখানে বাধা নয়।
  •  হিন্দু আইন: এখানে মেয়েদের শ্রেণিভাগ আছে এবং অগ্রাধিকারের ক্রম কঠোরভাবে মানা হয়:
    1. ​সবার আগে পাবে কুমারী কন্যা (অবিবাহিত)।
    2. ​তার অবর্তমানে পাবে বাগদত্তা কন্যা
    3. ​তার অবর্তমানে পাবে বিবাহিত কন্যা (যাদের পুত্র আছে বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে)।

​৫. মালিকানার ধরণ

  •  মুসলিম আইন: মেয়েরা মায়ের কাছ থেকে যে সম্পত্তি পায়, তার ওপর তাদের পূর্ণ মালিকানা থাকে। তারা চাইলেই তা বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারে।
  •  হিন্দু আইন: মায়ের কাছ থেকে পাওয়া স্ত্রীধনের ওপর মেয়েদের অধিকার সাধারণত জীবনস্বত্ব (Life Interest) হয়। অর্থাৎ, ভোগ করতে পারবে কিন্তু বিশেষ কারণ ছাড়া বিক্রি করতে পারবে না।

​ সারসংক্ষেপ (মোবাইল স্ন্যাপশট)

​ মুসলিম মেয়ে: মায়ের সম্পত্তিতে সব সময় অংশ পায়, কিন্তু ভাইয়ের চেয়ে অর্ধেক পায়।

​ হিন্দু মেয়ে: মায়ের ‘স্ত্রীধন’ সম্পত্তিতে ভাইদের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায় (বিশেষ করে অবিবাহিত অবস্থায়)। ভাই থাকলে মুসলিম মেয়েরা কম পায়, কিন্তু হিন্দু মেয়েরা শর্তসাপেক্ষে পুরোটাও পেতে পারে।

মালিকানার ধরন:
মুসলিম আইনে নারী উত্তরাধিকার সূত্রে যে সম্পত্তি পান, তার ওপর তার পূর্ণ বা নিঙ্কুশ মালিকানা (Absolute Ownership) থাকে। তিনি চাইলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন, দান করতে পারেন বা অন্য কাউকে উইল করে যেতে পারেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও সংস্কারের দাবি রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৫৬ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করে নারীদের সমান অধিকার দেওয়া হলেও, বাংলাদেশে এখনো পুরনো দায়াভাগ পদ্ধতিই বহাল আছে। তবে, বর্তমানে এ নিয়ে আইনি সংস্কারের আলোচনা চলছে।

লিখক: নাছের মিয়াজী, অ্যাডভোকেট।

#স্ত্রীধন

#দায়াভাগ

#ফারায়েজ

#PropertyRights

#WomensRightsBD

#InheritanceLaw

#BangladeshLaw