জমির মালিকানার অন্যতম প্রধান দলিল হলো খতিয়ান বা স্বত্বলিপি (Record of Rights)। জমি কেনাবেচা, নামজারি বা বন্টননামা—সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল খতিয়ানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জরিপ কর্মীদের অসাবধানতা বা মালিকপক্ষের অজ্ঞতার কারণে খতিয়ানে নানা ধরনের ভুল (যেমন—মালিকের নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ বা হিস্যায় ভুল) হতে পারে। খতিয়ানের কোন পর্যায়ে ভুল ধরা পড়লো, তার ওপর ভিত্তি করে সংশোধনের পদ্ধতি ও আদালত ভিন্ন হয়। নিচে খতিয়ানে ভুল সংশোধনের বিস্তারিত উপায় আলোচনা করা হলো:
১. মাঠ জরিপ বা ড্রাফট খতিয়ানের ভুল সংশোধন (জরিপ চলাকালীন)
জরিপ কাজ যখন চলমান থাকে, তখন ভুল সংশোধন করা সবচেয়ে সহজ এবং খরচও কম। জরিপ চলাকালীন কয়েকটি ধাপে ভুল সংশোধন করা যায়:
বুজরাত বা মাঠ পর্চা যাচাই: জরিপ কারীরা যখন মাঠে এসে মাপজোক করে ‘মাঠ পর্চা’ বা হাতে লেখা খতিয়ান দেন, তখনই সেটি মিলিয়ে দেখতে হবে। কোনো ভুল থাকলে তখনই আমিন বা সার্ভেয়ারকে জানিয়ে সংশোধন করিয়ে নেওয়া যায়।
তসদিক বা অ্যাটেস্টেশন পর্যায়: মাঠ পর্চা বিতরণের পর তসদিক স্তরেও ভুল ধরা পড়লে, রাজস্ব অফিসার বা সার্কেল অফিসারের কাছে প্রমাণসহ আবেদন করে তা ঠিক করা যায়।
আপত্তি বা ডিসপিউট (ধারা ৩০): খতিয়ানটি যখন ‘ড্রাফট’ বা খসড়া হিসেবে প্রকাশিত হয় (ডিপি খতিয়ান), তখন ভুল থাকলে ৩০ বিধিতে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আপত্তি বা ‘ডিসপিউট কেস’ দাখিল করতে হয়।
আপিল (ধারা ৩১): ৩০ বিধির রায়ে সন্তুষ্ট না হলে, রায় প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে ৩১ বিধিতে আপিল করা যায়। এটি সাধারণত চার্জ অফিসারের কাছে বা জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে করতে হয়।
রিভিশন (বোর্ড): আপিলের রায়েও সংক্ষুব্ধ হলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল বা ভূমি আপিল বোর্ডে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
২. চূড়ান্ত বা গেজেটভুক্ত খতিয়ানের ভুল সংশোধন (জরিপ শেষের পর)
জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়ে খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বা গেজেট হয়ে গেলে সেটেলমেন্ট অফিসের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। তখন প্রতিকার পেতে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল (LST): জরিপ পরবর্তী চূড়ান্ত প্রকাশনায় (যেমন বি.এস খতিয়ান) ভুল থাকলে গেজেট প্রকাশের ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার ‘ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল’-এ মামলা করতে হয়।
দেওয়ানী আদালত (ঘোষণামূলক মামলা): যদি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সময়সীমা পার হয়ে যায় অথবা ট্রাইব্যুনাল গঠিত না থাকে, তবে দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী ‘ঘোষণামূলক মামলা’ (Declaration Suit) দায়ের করে খতিয়ান সংশোধন করতে হয়। এই মামলায় ভুল খতিয়ানটি অবৈধ এবং বাদীর স্বত্ব বহাল আছে মর্মে ঘোষণা চাওয়া হয়।
৩. নামজারি খতিয়ানের ভুল সংশোধন
জমি কেনার পর বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর নামজারি (Mutation) করতে গিয়ে যদি খতিয়ানে ভুল হয়, তবে তার সমাধান সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসেই সম্ভব।
মিস কেস (Review): নামজারি খতিয়ানে করণিক ভুল (যেমন নামের বানান বা দাগ নম্বর ভুল) হলে এসি ল্যান্ড বরাবর ‘মিস কেস’ বা পর্যালোচনার আবেদন করা যায়।
আপিল: যদি এসি ল্যান্ড আবেদন খারিজ করে দেন, তবে ওই আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করতে হবে।
রিভিশন: এডিসি (রেভিনিউ)-এর আদেশে সন্তুষ্ট না হলে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) এবং সর্বশেষে ভূমি আপিল বোর্ডে প্রতিকার চাওয়া যায়।
৪. করণিক ভুল (Clerical Mistake) সংশোধন
চূড়ান্ত খতিয়ানে যদি বড় কোনো স্বত্বের পরিবর্তন না ঘটে, শুধুমাত্র ছোটখাটো করণিক ভুল (যেমন- নামের বানানে সামান্য ভুল, পিতার নামে ভুল) থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৪৯ ধারা অনুযায়ী এসি ল্যান্ড বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করে তা সংশোধন করা যায়। একে রেকর্ড কারেকশন কেসও বলা হয়।
উপসংহার
জমির খতিয়ানে ভুল থাকলে তা ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই জরিপ চলাকালীন সময়েই জমির মালিকদের সতর্ক থাকা উচিত। আর যদি ভুল হয়েই যায়, তবে দালালের খপ্পরে না পড়ে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শে সঠিক আদালতে সঠিক সময়ে মামলা বা আবেদন করলে অবশ্যই প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
যোগাযোগ ও বিস্তারিত:
অ্যাডভোকেট নাছের মিয়াজী
জজ কোর্ট, ফেনী।
চেম্বার: রুম নং-২২, তরণীনিবাস সিটি কমপ্লেক্স, ট্রাংক রোড, ফেনী।
ইমেইল: nasermiazifenicourt@gmail.com
ফেসবুকের জন্য হ্যাশট্যাগ:
#LandLaw #KhatiyanCorrection #Namjari #LandSurvey #BDLaw #AdvocateNaserMiazi #FeniCourt #LegalAdviceBD #জমিরআইন #খতিয়ানসংশোধন
ফেসবুক পেইজ: 7 Minutes Bangla
আইডি: Advocate-Naser Miazi
ওয়েবসাইট: https://lawacademybd.com
