লিখক: অ্যাডভোকেট নাছের মিয়াজী, জজ কোর্ট, ফেনী।
# প্রশ্ন ১: চলাচলের একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দিলে ফৌজদারী আদালতে (Criminal Court) কী প্রতিকার পাওয়া যায় এবং এর আইনি ধারাগুলো কী?
উত্তর:
যদি কেউ অন্যের জমির ওপর দিয়ে দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তা হঠাৎ বন্ধ করে দেয় এবং এর ফলে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য ফৌজদারী আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সবচেয়ে দ্রুততম মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ধারায় মামলা করা যায়:
১. ফৌজদারী কার্যবিধি (CrPC), ১৮৯৮ এর ১৪৭ ধারা:
এটি রাস্তার বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ফৌজদারী প্রতিকার। যদি রাস্তাটি ব্যবহার করার অধিকার (Right of User) নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় এবং শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে, তবে ভুক্তভোগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই ধারায় মামলা করতে পারেন।
- প্রতিকার: ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত সাপেক্ষে যদি প্রমাণ পান যে ওই রাস্তার ওপর বাদীর ব্যবহারের অধিকার আছে, তবে তিনি বিবাদীকে রাস্তাটি উন্মুক্ত রাখার এবং ভবিষ্যতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
২. দণ্ডবিধি (Penal Code), ১৮৬০ এর ৩৪১ ধারা (অন্যায়ভাবে বাধা দান):
রাস্তাটি যদি বাদীর চলাচলের একমাত্র পথ হয় এবং বিবাদী ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে বাধা সৃষ্টি করে (যেমন: বেড়া দিয়ে বা গর্ত খুঁড়ে), তবে এটি ‘Wrongful Restraint’ বা অন্যায়ভাবে বাধা দানের অপরাধ।- প্রতিকার: এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী থানায় এজাহার বা আদালতে সি.আর (C.R) মামলা করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণ হলে বিবাদীর ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
# প্রশ্ন ২: রাস্তার অধিকার চিরস্থায়ীভাবে ফিরে পেতে দেওয়ানী আদালতে (Civil Court) কী প্রতিকার রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলো কী?
উত্তর:
ফৌজদারী আদালত সাময়িক শান্তি বজায় রাখে, কিন্তু রাস্তার মালিকানা বা ব্যবহারের অধিকার (Title or Easement Right) চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে দেওয়ানী আদালতের বিকল্প নেই। দেওয়ানী প্রতিকারগুলো নিম্নরূপ:
১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (Specific Relief Act), ১৮৭৭ এর ৫৫ ধারা (বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা):
যেহেতু প্রশ্নে বলা হয়েছে রাস্তাটি ইতিমধ্যে ‘বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে’, তাই শুধু সাধারণ নিষেধাজ্ঞায় কাজ হবে না। আপনাকে ‘বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা’ বা Mandatory Injunction চাইতে হবে।
- প্রতিকার: আদালত বিবাদীকে নির্দেশ দেবেন যে প্রতিবন্ধকতাটি (যেমন: ইটের দেয়াল বা বেড়া) তৈরি করা হয়েছে, তা বিবাদীর নিজ খরচে ভেঙে ফেলে রাস্তাটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে।
২. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ৪২ ধারা (অধিকার ঘোষণা):
রাস্তাটি ব্যবহারের আইনগত অধিকার বাদীর আছে—এই মর্মে আদালতের ঘোষণা (Declaration) চাইতে হবে।
৩. তামাদি আইন (Limitation Act), ১৯০৮ এর ২৬ ধারা (সুখাধিকার অর্জন):
যদি বাদী প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি বা তার পূর্বসূরিরা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে এই রাস্তাটি বিনা বাধায়, প্রকাশ্যে এবং অধিকার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন, তবে তিনি ‘Prescriptive Easement Right’ বা সুখাধিকার অর্জন করবেন।
৪. ইজমেন্ট অ্যাক্ট (Easements Act), ১৮৮২ এর ১৩ ধারা (আবশ্যিক সুখাধিকার):
আপনার প্রশ্নে উল্লেখ আছে এটি “বাড়ীর একমাত্র রাস্তা”। যদি এমন হয় যে ওই রাস্তা ছাড়া বাদীর বাড়িতে ঢোকার আর কোনো বিকল্প পথ নেই, তবে ২০ বছর ব্যবহার না করলেও বাদী ‘Easement of Necessity’ বা আবশ্যিক সুখাধিকার দাবি করতে পারেন। এটি খুবই শক্তিশালী একটি পয়েন্ট।
# প্রশ্ন ৩: এই ধরনের বিরোধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া (Procedure) কী?
উত্তর:
মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াটি প্রতিকারের ধরণের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়:
ক) ফৌজদারী মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া:
১. বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (ফেনী) ১৪৭ ধারায় পিটিশন মামলা দায়ের করতে হবে।
২. আরজিতে স্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে যে, রাস্তাটি বন্ধ করার কারণে শান্তি ভঙ্গের ‘আসন্ন আশঙ্কা’ রয়েছে।
৩. আদালত সাধারণত স্থানীয় থানা বা এসিল্যান্ডের মাধ্যমে তদন্ত রিপোর্ট চাইবেন। রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত রাস্তা খুলে দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন।
খ) দেওয়ানী মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া:
১. এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ আদালতে একটি স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা (Suit for Declaration and Mandatory Injunction) দায়ের করতে হবে।
২. আরজির সাথে একটি ‘অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার’ (Temporary Injunction under Order 39, Rule 1 & 2 of CPC) আবেদন দিতে হবে, যাতে মামলা চলাকালীন বিবাদী রাস্তার কোনো পরিবর্তন করতে না পারে।
৩. নালিশী পথের একটি নকশা (Sketch Map) আরজির সাথে সংযুক্ত করা জরুরি।
৪. প্রয়োজনে ‘লোকাল ইনভেস্টিগেশন’ বা কমিশনের (Order 26, Rule 9) মাধ্যমে আদালতের সার্ভেয়ার দিয়ে সরেজমিনে রাস্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করাতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
দ্রুত রাস্তা খোলার জন্য প্রথমে ১৪৭ ধারায় ফৌজদারী মামলা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর অধিকারটি চিরস্থায়ী করার জন্য পরবর্তীতে বা একই সাথে দেওয়ানী মোকদ্দমা (ঘোষণা ও ম্যান্ডেটরি ইনজাংশন) দায়ের করতে হবে। যেহেতু এটি “একমাত্র রাস্তা”, তাই দেওয়ানী আদালতে ‘আবশ্যিক সুখাধিকার’ (Easement of Necessity)-এর বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
