বাংলাদেশের আইনে ইসলামি শরিয়তের প্রয়োগ: একটি সহজ পর্যালোচনা

আসুন, বাংলাদেশী মুসলিম হিসাবে জেনে নিই ৮৮% মুসলমানের বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়তের কোন বিধি বিধান কোন কোন আইনে কার্যকর আছে।

লিখক: অ্যাডভোকেট নাছের মিয়াজী, nasermiazifenicourt@gmail.com


বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দেওয়ানি ও পারিবারিক বিষয়গুলোতে ইসলামি শরিয়তের প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে শরিয়তের বিধানগুলোই আইনের মূল ভিত্তি। নিচে প্রধান আইনগুলো এবং সেগুলোতে শরিয়তের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হলো।

বাংলাদেশে যে আইনগুলোতে ইসলামি শরিয়তের প্রত্যক্ষ প্রয়োগ বা অন্তত একটি বিধি-বিধানও অন্তর্ভুক্ত আছে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই তালিকাটি আপনার লিগ্যাল প্র্যাকটিস এবং স্টাডির জন্য সহায়ক হবে।
১. মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ (The Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: এটিই মূল আইন যা নিশ্চিত করে যে মুসলিমদের বিবাহ, মোহরানা, ভরণপোষণ, তালাক, ওলিয়ত (অভিভাবকত্ব), দান, ট্রাস্ট এবং ওয়াকফ সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে শরিয়ত মোতাবেক, অন্য কোনো প্রথা অনুযায়ী নয়।

২. মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ (The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: ইসলামি ‘খুলা’ বা ‘ফাসখে নিকাহ’ নীতির ওপর ভিত্তি করে নারীদের আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার ৯টি সুনির্দিষ্ট কারণ এই আইনে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।

৩. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: বহুবিবাহের শর্ত, তালাকের পদ্ধতি (নোটিশ ও ইদ্দত), এবং উত্তরাধিকারের কিছু বিধান (যেমন: মৃত ছেলের সন্তানদের অংশ পাওয়ার ‘ডকট্রিন অফ রিপ্রেজেন্টেশন’) শরিয়তের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে (কিছু সংস্কারসহ) তৈরি।

৪. মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ (The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: যদিও এটি প্রশাসনিক আইন, কিন্তু নিকাহনামার ফরম এবং তালাক রেজিস্ট্রেশনের বাধ্যবাধকতা শরিয়তি বিবাহের প্রমাণ ও দেনমোহর আদায়ের সুরক্ষার জন্যই করা হয়েছে।

৫. অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ (The Guardians and Wards Act, 1890)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: এটি একটি সেক্যুলার আইন হলেও, মুসলিমদের ক্ষেত্রে আদালত শরিয়তের ‘হিজানাত’ (Hizanat) নীতি অনুসরণ করেন। যেমন: নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়ের জিম্মায় সন্তান থাকা।

৬. রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (The State Acquisition and Tenancy Act, 1950)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: এই আইনের ৯৬ ধারায় ‘অগ্রক্রয়’ বা ‘প্রিয়েমশন’ (Pre-emption) এর যে বিধান রাখা হয়েছে, তা সরাসরি ইসলামি আইনের ‘হক-এ-শুফা’ (Haq-shufa) নীতি থেকে গৃহীত।

৭. অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ (The Non-Agricultural Tenancy Act, 1949)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: এই আইনের ২৪ ধারায়ও শরিয়তের ‘হক-এ-শুফা’ বা অগ্রক্রয়ের নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে শহুরে বা অকৃষি জমির ক্ষেত্রে।

৮. ওয়াকফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ (The Wakf Ordinance, 1962) ও ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইন, ২০১৩

  • শরিয়তের প্রয়োগ: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দানকৃত সম্পত্তি বা ওয়াকফ কীভাবে পরিচালিত হবে, মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব কী হবে—এ সবই ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী এই আইনে নির্ধারিত।

৯. পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (The Family Courts Ordinance, 1985)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: এই আইনটি মূলত পদ্ধতিগত (Procedural), কিন্তু এটি যে ৫টি বিষয়ের বিচার করার এখতিয়ার দেয় (বিবাহ বিচ্ছেদ, মোহরানা, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব, দাম্পত্য পুনরুদ্ধার)—তার সবই শরিয়তি আইনের বিষয়বস্তু।

১০. দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (The Code of Civil Procedure, 1908)

  • শরিয়তের প্রয়োগ (পরোক্ষ): এই আইনের ১৩২ ধারায় পর্দাশীন নারীদের আদালতে স্বশরীরে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা ইসলামি পর্দা প্রথার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই রাখা হয়েছে।

১১. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (The Evidence Act, 1872)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: সন্তানের বৈধতা (Legitimacy) নির্ধারণের ক্ষেত্রে ১১২ ধারায় যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছে (বিবাহের সময় বা বিবাহ বিচ্ছেদের ২৮০ দিনের মধ্যে জন্ম), তা অনেক ক্ষেত্রে শরিয়তের ‘নসব’ বা পিতৃপরিচয় নির্ধারণের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হলে মুসলিম পারিবারিক আইনে শরিয়তের নীতিকেই প্রাধান্য দেওয়ার নজির রয়েছে।

১২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh)

  • শরিয়তের প্রসঙ্গ: সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদিও এটি সরাসরি শরিয়ত আইন নয়, তবুও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনে ইসলামের স্বীকৃতি অন্য সকল আইনে শরিয়তের মর্যাদাকে পরোক্ষভাবে সুসংহত করে।

১৩. হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১ (Hajj and Umrah Management Act, 2021)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: হজ ও ওমরাহ পালন ইসলামি শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ। এই পুরো আইনটিই তৈরি করা হয়েছে যাতে মুসলিমরা শরিয়ত সম্মত উপায়ে সুষ্ঠুভাবে হজ ও ওমরাহ পালন করতে পারেন। হাজিদের সাথে প্রতারণা রোধ এবং শরিয়তি বিধান মেনে এজেন্সিগুলো যেন কাজ করে, তা নিশ্চিত করাই এই আইনের লক্ষ্য।

১৪. জাকাত তহবিল অধ্যাদেশ, ১৯৮২ (Zakat Fund Ordinance, 1982)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: ইসলামি অর্থনীতির মূল স্তম্ভ ‘জাকাত’ সংগ্রহ ও বণ্টনের জন্য এই আইনটি করা হয়েছে। শরিয়তে নির্ধারিত খাতগুলোতেই (যেমন: গরিব, মিসকিন, নওমুসলিম ইত্যাদি) যেন সরকারি জাকাত তহবিলের অর্থ ব্যয় হয়, তা এই আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।

১৫. কাজি আইন, ১৮৮০ (The Kazis Act, 1880)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: যদিও ১৯৭৪ সালের আইনটি এখন বেশি প্রচলিত, তবুও ১৮৮০ সালের এই আইনটি এখনো বলবৎ আছে। এই আইন অনুযায়ী সরকার মুসলিমদের বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি করার জন্য ‘কাজি’ নিয়োগ দেয়। ‘কাজি’ বা বিচারক/রেজিস্ট্রার ধারণাটি সরাসরি ইসলামি বিচার ব্যবস্থা থেকে আগত।

১৬. ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৭৫ (Islamic Foundation Act, 1975)

  • শরিয়তের প্রয়োগ: ইসলামি আদর্শ, মূল্যবোধ ও শরিয়তের শিক্ষা প্রচার এবং গবেষণার জন্য এই আইনের মাধ্যমে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। চাঁদ দেখা কমিটি (যা শরিয়তের হিলাল বা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল) এবং ফতোয়া সংক্রান্ত গবেষণা এই আইনের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়।

১৭. দান কর আইন, ১৯৯০ (Gift Tax Act, 1990) – এর ব্যতিক্রম

  • শরিয়তের প্রয়োগ: সাধারণ নিয়মে দানের ওপর কর দিতে হয়। কিন্তু এই আইনের ২(চ) ধারার বিধানে বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে হেবা বা দান (যা শরিয়ত সম্মত দান) করমুক্ত থাকবে। এটি শরিয়তের ‘হেবা’ (Hiba) এবং রক্ত সম্পর্কের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে করা হয়েছে।

১৮. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860) – ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা

  • শরিয়তের প্রয়োগ (পরোক্ষ): দণ্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৫ক ধারা অনুযায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা পবিত্র স্থান অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআন মাজিদ, মসজিদ বা রাসুল (সা.)-এর শানে বেয়াদবি বা কটূক্তি করলে এই ধারায় বিচার হয়, যা ইসলামি শরিয়তের ‘ধর্ম অবমাননার শাস্তি’র ধারণাকে সমর্থন করে (যদিও শাস্তির মাত্রা ভিন্ন)।

১৯. মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) বিধিমালা, ২০০৯

  • শরিয়তের প্রয়োগ: ১৯৭৪ সালের আইনের অধীনে তৈরি এই বিধিমালায় ‘নিকাহনামা’ (ফরম-ডি) এর কাঠামো দেওয়া আছে। নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে ‘তালাক-ই-তৌফিজ’ (স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ) এর বিষয়টি উল্লেখ আছে, যা সরাসরি ইসলামি ফিকহ থেকে গৃহীত একটি বিধান।

এই আইনগুলোর বাহিরে আর কোন আইনে শরিয়তের প্রয়োগ থাকলে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

BangladeshLaw #ShariaLaw #FamilyLaw #AdvocateNaserMiazi #LegalAwareness #FeniBar #Heirship #Preemption