১. শত্রু সম্পত্তি কী? (Enemy Property)
১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান সরকার “Defence of Pakistan Rules, 1965” জারি করে। এই নিয়ম অনুযায়ী ভারতের নাগরিক, অথবা পাকিস্তানের এমন নাগরিক যারা যুদ্ধের সময় ভারতে চলে যায়, অথবা যাদের ভারতীয় স্বার্থের প্রতি আনুগত্য আছে বলে সন্দেহ করা হয়—তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি পাকিস্তান সরকার হেফাজতে নেয়। এই সম্পত্তিগুলোকে বলা হয় “শত্রু সম্পত্তি”, কারণ তখন ভারত পাকিস্তানের কাছে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত ছিল।
এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের নাগরিকদের বা ভারতপন্থী ব্যক্তিদের সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয় যাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত এই Enemy Property আইন কার্যকর ছিল।
২. অর্পিত সম্পত্তি কী? (Vested Property)
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ফলে “শত্রু সম্পত্তি” শব্দটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য অযৌক্তিক হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালে সরকার “Vested and Non-Resident Property (Administration) Act, 1974” প্রণয়ন করে। এই আইনে পূর্বের সব শত্রু সম্পত্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু Non-Resident Property বাংলাদেশ সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এর ফলে এগুলোর নতুন নাম হয় “অর্পিত সম্পত্তি” বা Vested Property। সরকার এই সম্পত্তির কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ সম্পত্তিগুলো সরকারের কাছে অর্পিত থাকে এবং সরকার এগুলোর প্রশাসন পরিচালনা করে।
সহজ ভাষায়, যে সম্পত্তি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত “শত্রু সম্পত্তি” নামে পরিচিত ছিল, ১৯৭৪ সালের আইনের পর সেই একই সম্পত্তি “অর্পিত সম্পত্তি” নামে পরিচিত হয়।
৩. অর্পিত সম্পত্তির ক তফসিল ও খ তফসিল কী?
অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করার জন্য সরকার ২০০১ সালে “অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১” প্রণয়ন করে। এই আইনে অর্পিত সম্পত্তিকে দুটি তালিকায় ভাগ করা হয়।
ক তফসিল বলতে এমন অর্পিত সম্পত্তিকে বোঝায় যা সরকারের দখলে আছে বা সরকার ইজারা দিয়ে পরিচালনা করছে। প্রকৃত মালিকেরা চাইলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা করে এগুলো ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে পারেন।
খ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তিগুলো হল এমন সম্পত্তি, যেগুলো কাগজে অর্পিত হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষের দখলে ও মালিকানায় ছিল। সরকার এই তালিকা বাতিল করেছে, ফলে বর্তমানে খ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি সাধারণ জমির মতোই নামজারি ও হস্তান্তরযোগ্য। যদিও কিছু জেলায় প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই করা হয়।
৪. পরিত্যক্ত সম্পত্তি কী? (Abandoned Property)
পরিত্যক্ত সম্পত্তি শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তির মতো নয়; এর উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পরে বহু পাকিস্তানি নাগরিক বাংলাদেশ ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে যায় এবং তারা আর ফিরে আসে না। এই ধরনের সম্পত্তির আইনগত ভিত্তি হলো রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৬, ১৯৭২ — “Bangladesh Abandoned Property (Control, Management and Disposal) Order, 1972”।
এই আইনের অধীনে যেসব ব্যক্তি ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পরে বাংলাদেশে ছিলেন না, অথবা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর পরে আর ফিরে আসেননি, বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি—তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি বলা হয়। এসব সম্পত্তির মালিকানা সরাসরি বাংলাদেশের সরকারের কাছে চলে যায় এবং সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়।
৫. অর্পিত সম্পত্তি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকে অর্পিত সম্পত্তি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে একই ধরনের মনে করেন, যা প্রকৃতপক্ষে ভুল। অর্পিত সম্পত্তির উৎস পাকিস্তান আমলে ভারতীয় নাগরিক বা ভারতপন্থী ব্যক্তিদের সম্পত্তি থেকে এসেছে। অপরদিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির উৎস হলো ১৯৭১ সালে দেশত্যাগী পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি। এ দুই ধরনের সম্পত্তির প্রশাসনিক পরিচালনাও ভিন্ন। অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়, আর পরিত্যক্ত সম্পত্তি সাধারণত কোর্ট অফ সেটেলমেন্ট বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় বহু সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল এবং এসব নিয়ে বহু মামলা-মোকদ্দমাও চলমান।
৬. সংক্ষিপ্ত উপসংহার
ভারতপন্থী বা ভারতে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পত্তি পাকিস্তান সরকার প্রথমে “শত্রু সম্পত্তি” হিসেবে ঘোষণা করেছিল। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৪ সালের আইনে সেই সম্পত্তির নাম পরিবর্তন করে “অর্পিত সম্পত্তি” করে। অপরদিকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া ও আর বাংলাদেশে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তিকে ১৯৭২ সালের আইনে “পরিত্যক্ত সম্পত্তি” ঘোষণা করা হয়। এই তিনটি টার্মের ইতিহাস, প্রশাসনিক ধাপ ও আইনি কাঠামো আলাদা হলেও বাংলাদেশের জমি আইন বোঝার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিখক:
নাছের উদ্দিন মিয়াজী,
জজ কোর্ট, ফেনী।
